৬.১ কনিকের সংজ্ঞা ও পরাবৃত্তের মৌলিক ধারণা

কনিক (Conic Sections) হলো একটি ডবল-শঙ্কু (Double Cone) কে একটি সমতল দ্বারা কর্তন করলে যে বক্ররেখাগুলো উৎপন্ন হয়। প্রাচীন গ্রিক জ্যামিতিতে এগুলোর সূত্রপাত হলেও বর্তমানে পদার্থবিজ্ঞান, প্রকৌশল, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও দৈনন্দিন জীবনের নানা ক্ষেত্রে এদের প্রয়োগ অপরিসীম। কনিক তিন প্রকার: পরাবৃত্ত (Parabola), উপবৃত্ত (Ellipse) এবং অধিবৃত্ত (Hyperbola)। এই অধ্যায়ে আমরা প্রধানত পরাবৃত্তের বিস্তারিত আলোচনা করব, যার প্রতিটি বিন্দু একটি নির্দিষ্ট বিন্দু (উপকেন্দ্র) এবং একটি নির্দিষ্ট সরলরেখা (নিয়ামত) থেকে সমদূরত্বে অবস্থিত।

কনিকের সংজ্ঞা ও উৎকেন্দ্রিকতা

একটি অচল বিন্দু এবং একটি অচল সরলরেখা থেকে যে সকল বিন্দুর দূরত্বের অনুপাত সর্বদা অপরিবর্তনীয় (constant) থাকে, সেই সকল বিন্দুর স্থানাঙ্কের সেটকে কনিক বলে। এই অচল বিন্দুকে উপকেন্দ্র (Focus), অচল সরলরেখাকে নিয়ামত (Directrix) এবং দূরত্বের অনুপাতকে উৎকেন্দ্রিকতা (Eccentricity) বলা হয়।

ধরা যাক, একটি বিন্দু \(P\) উপকেন্দ্র \(S\) থেকে \(SP\) দূরত্বে এবং নিয়ামত থেকে \(PM\) লম্ব দূরত্বে অবস্থিত। তাহলে:

\[\frac{SP}{PM} = e\]

যেখানে \(e\) হলো উৎকেন্দ্রিকতা।

উৎকেন্দ্রিকতার ভিত্তিতে কনিকের শ্রেণীবিভাগ

উৎকেন্দ্রিকতার মানের উপর ভিত্তি করে কনিককে তিন ভাগে ভাগ করা যায়:

  • পরাবৃত্ত (Parabola): যখন \(e = 1\)। অর্থাৎ উপকেন্দ্র ও নিয়ামত থেকে দূরত্ব সমান। এটি একটি উন্মুক্ত বক্ররেখা যা একটি দিকে অসীম ব্যাপ্ত।
  • উপবৃত্ত (Ellipse): যখন \(e < 1\)। উপকেন্দ্র থেকে দূরত্ব নিয়ামত থেকে দূরত্বের চেয়ে কম। এটি একটি বদ্ধ বক্ররেখা।
  • অধিবৃত্ত (Hyperbola): যখন \(e > 1\)। উপকেন্দ্র থেকে দূরত্ত নিয়ামত থেকে দূরত্বের চেয়ে বেশি। এটি দুটি শাখাবিশিষ্ট উন্মুক্ত বক্ররেখা।

যদি \(e = 0\) হয়, তবে কনিকটি একটি বৃত্তে (Circle) পরিণত হয়, যা উপবৃত্তের বিশেষ রূপ। আবার যদি \(e \to \infty\) হয়, তবে এটি একটি সরলরেখার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। এই অধ্যায়ে আমরা বিশেষভাবে \(e = 1\) এর ক্ষেত্র, অর্থাৎ পরাবৃত্তের বিস্তারিত আলোচনা করব।

পরাবৃত্তের প্রমিত সমীকরণ ও মূল বিন্দুগামী সমীকরণ

পরাবৃত্তের সমীকরণ নির্ণয় করতে হলে আমাদের প্রথমে একটি উপযুক্ত স্থানাঙ্ক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সাধারণত, মূল বিন্দু \(O(0,0)\) কে পরাবৃত্তের শীর্ষবিন্দু (Vertex) ধরে এবং অক্ষগুলোকে পরাবৃত্তের অক্ষের সমান্তরাল করে সমীকরণ সূত্রীকরণ করা হয়।

প্রমিত সমীকরণের উৎপত্তি

ধরা যাক, উপকেন্দ্র \(S\) এর স্থানাঙ্ক \((a, 0)\) এবং নিয়ামতের সমীকরণ \(x = -a\) অর্থাৎ \(x + a = 0\), যেখানে \(a > 0\)। শীর্ষবিন্দু \(O(0,0)\) উপকেন্দ্র ও নিয়ামতের মধ্যবিন্দুতে অবস্থিত। পরাবৃত্তের উপর অবস্থিত যেকোনো বিন্দু \(P(x, y)\) এর জন্য সংজ্ঞা অনুযায়ী:

\[SP = PM\]

যেখানে \(PM\) হলো বিন্দু \(P\) হতে নিয়ামতের উপর অঙ্কিত লম্ব।

\[\sqrt{(x-a)^2 + y^2} = \frac{|x + a|}{\sqrt{1^2 + 0^2}} = |x + a|\]

উভয় পক্ষ বর্গ করে:

\[(x-a)^2 + y^2 = (x+a)^2\]

\[x^2 - 2ax + a^2 + y^2 = x^2 + 2ax + a^2\]

\[y^2 = 4ax\]

এটি পরাবৃত্তের প্রমিত সমীকরণ (Standard Equation)। এখানে \(a\) কে পরাবৃত্তের অভিলক্ষণ (Parameter) বলা হয়, যা পরাবৃত্তের আকার ও আয়তন নির্ধারণ করে।

চারটি প্রধান প্রমিত রূপ

পরাবৃত্তের অক্ষের অবস্থানের উপর ভিত্তি করে চারটি প্রধান সমীকরণ রয়েছে:

অক্ষের দিক সমীকরণ উপকেন্দ্র নিয়ামত শীর্ষ
ধনাত্মক \(x\)-অক্ষ \(y^2 = 4ax\) \((a, 0)\) \(x + a = 0\) \((0, 0)\)
ঋণাত্মক \(x\)-অক্ষ \(y^2 = -4ax\) \((-a, 0)\) \(x - a = 0\) \((0, 0)\)
ধনাত্মক \(y\)-অক্ষ \(x^2 = 4ay\) \((0, a)\) \(y + a = 0\) \((0, 0)\)
ঋণাত্মক \(y\)-অক্ষ \(x^2 = -4ay\) \((0, -a)\) \(y - a = 0\) \((0, 0)\)

মূল বিন্দুগামী সাধারণ সমীকরণ

যদি পরাবৃত্তের শীর্ষ মূল বিন্দুতে না থেকে অন্য কোনো বিন্দুতে অবস্থিত হয়, তবে সমীকরণের রূপ পরিবর্তন হয়। ধরা যাক শীর্ষবিন্দু \((h, k)\) এবং অক্ষ \(x\)-অক্ষের সমান্তরাল। তাহলে সমীকরণ হয়:

\[(y-k)^2 = 4a(x-h)\]

এবং উপকেন্দ্রের স্থানাঙ্ক হয় \((h+a, k)\) এবং নিয়ামতের সমীকরণ \(x = h-a\)।

অক্ষ যদি \(y\)-অক্ষের সমান্তরাল হয়, তবে:

\[(x-h)^2 = 4a(y-k)\]

সাধারণ সমীকরণের বিশ্লেষণ

দ্বিঘাত সমীকরণ \(y = Ax^2 + Bx + C\) বা \(x = Ay^2 + By + C\) আকারের যেকোনো সমীকরণই একটি পরাবৃত্ত নির্দেশ করে। যেমন:

\(y = 2x^2 - 4x + 3\) সমীকরণটিকে পূর্ণবর্গ করে লেখা যায়:

\[y = 2(x^2 - 2x) + 3 = 2(x-1)^2 - 2 + 3 = 2(x-1)^2 + 1\]

\[\Rightarrow (x-1)^2 = \frac{1}{2}(y-1)\]

যা একটি পরাবৃত্ত যার শীর্ষ \((1, 1)\) এবং \(4a = \frac{1}{2}\) অর্থাৎ \(a = \frac{1}{8}\)।

উপকেন্দ্রিক লম্বের দৈর্ঘ্য, উপকেন্দ্র ও শীর্ষবিন্দুর স্থানাঙ্ক

উপকেন্দ্রিক লম্ব (Latus Rectum)

পরাবৃত্তের উপকেন্দ্র দিয়ে অক্ষের উপর লম্ব অর্থাৎ অক্ষের সমান্তরাল যে জ্যা অঙ্কন করা হয়, তাকে উপকেন্দ্রিক লম্ব (Latus Rectum) বলে। এটি পরাবৃত্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য নির্দেশক রেখাংশ।

\(y^2 = 4ax\) পরাবৃত্তের ক্ষেত্রে, উপকেন্দ্র \(S(a, 0)\)। উপকেন্দ্রিক লম্ব \(x = a\) রেখার উপর অবস্থিত। পরাবৃত্তের সমীকরণে \(x = a\) বসালে:

\[y^2 = 4a \cdot a = 4a^2\]

\[\Rightarrow y = \pm 2a\]

সুতরাং উপকেন্দ্রিক লম্বের প্রান্তবিন্দু দুটির স্থানাঙ্ক \((a, 2a)\) এবং \((a, -2a)\)।

উপকেন্দ্রিক লম্বের দৈর্ঘ্য: \(4a\)

অর্ধেক উপকেন্দ্রিক লম্বের দৈর্ঘ্য: \(2a\) (semi-latus rectum)

উপকেন্দ্রিক লম্বের দৈর্ঘ্য পরাবৃত্তের প্রশস্ততা বোঝায়। \(a\) এর মান বড় হলে পরাবৃত্তটি চওড়া হয় এবং \(a\) এর মান ছোট হলে পরাবৃত্তটি সরু ও লম্বা হয়।

মৌলিক বিন্দুসমূহের স্থানাঙ্ক সারণী

প্রমিত সমীকরণ \(y^2 = 4ax\) এর জন্য:

  • শীর্ষবিন্দু (Vertex): \((0, 0)\) - উপকেন্দ্র ও নিয়ামতের মধ্যবিন্দু, যেখানে পরাবৃত্তের বক্রতা পরিবর্তন হয়।
  • উপকেন্দ্র (Focus): \((a, 0)\) - অক্ষের উপর অবস্থিত বিন্দু, শীর্ষ থেকে \(a\) দূরত্বে।
  • উপকেন্দ্রিক লম্বের প্রান্তবিন্দু: \((a, 2a)\) ও \((a, -2a)\)

নিয়ামতের সমীকরণ ও বৈশিষ্ট্য

নিয়ামত হলো একটি সরলরেখা যা উপকেন্দ্রের বিপরীত দিকে শীর্ষ থেকে সমদূরত্বে অবস্থিত। \(y^2 = 4ax\) এর জন্য নিয়ামতের সমীকরণ:

\[x + a = 0\] বা \[x = -a\]

নিয়ামত অক্ষের উপর লম্ব এবং শীর্ষ থেকে \(a\) দূরত্বে অবস্থিত। উপকেন্দ্র ও নিয়ামত পরাবৃত্তের দুটি মৌলিক উপাদান যা এর জ্যামিতিক গঠন নির্ধারণ করে।

অক্ষ ও বক্রতার দিক

পরাবৃত্তের অক্ষ (Axis) হলো সরলরেখা যা উপকেন্দ্র দিয়ে নিয়ামতের উপর লম্ব হয়ে যায় এবং পরাবৃত্তের দুটি অংশে সমমিতি থাকে। \(y^2 = 4ax\) এর অক্ষ \(x\)-অক্ষ। পরাবৃত্তের যে দিকে খোলা থাকে সেদিকেই অক্ষের ধনাত্মক দিক ধরা হয়।

পরামিতিক সমীকরণ ও পরাবৃত্তের বিভিন্ন আকার

পরামিতিক উপস্থাপন (Parametric Representation)

পরাবৃত্তের বিন্দুসমূহকে একটি চলকের সাহায্যে প্রকাশ করলে বিভিন্ন জ্যামিতিক সমস্যার সমাধান সহজ হয়। \(y^2 = 4ax\) পরাবৃত্তের পরামিতিক সমীকরণ:

\[x = at^2, \quad y = 2at\]

যেখানে \(t\) একটি পরামিতি (parameter) যা যেকোনো বাস্তব সংখ্যা হতে পারে।

পরামিতি \(t\) এর বিভিন্ন মানের জন্য পরাবৃত্তের বিভিন্ন বিন্দু পাওয়া যায়। যেমন:

  • \(t = 0\) হলে বিন্দু \((0, 0)\) অর্থাৎ শীর্ষবিন্দু
  • \(t = 1\) হলে বিন্দু \((a, 2a)\), যা উপকেন্দ্রিক লম্বের একটি প্রান্তবিন্দু
  • \(t = -1\) হলে বিন্দু \((a, -2a)\), উপকেন্দ্রিক লম্বের অন্য প্রান্তবিন্দু

বিন্দু \((at^2, 2at)\) কে সংক্ষেপে বিন্দু \(t\) বলা হয়। এই পদ্ধতিতে পরাবৃত্তের স্পর্শক ও অধিঃস্পর্শক সমীকরণ সহজে নির্ণয় করা যায়।

পরাবৃত্তের বিভিন্ন আকার ও অবস্থান

নির্দিষ্ট স্থানাঙ্ক ব্যবস্থায় পরাবৃত্তের চারটি মৌলিক অবস্থান রয়েছে:

১. ডানদিকে খোলা (Standard Position)

সমীকরণ: \(y^2 = 4ax\) \((a > 0)\)

শীর্ষ: \((0,0)\), উপকেন্দ্র: \((a,0)\), অক্ষ: \(x\)-অক্ষের ধনাত্মক দিকে

নিয়ামত: \(x = -a\)

২. বামদিকে খোলা

সমীকরণ: \(y^2 = -4ax\) \((a > 0)\)

শীর্ষ: \((0,0)\), উপকেন্দ্র: \((-a,0)\), অক্ষ: \(x\)-অক্ষের ঋণাত্মক দিকে

নিয়ামত: \(x = a\)

বৈশিষ্ট্য: উপকেন্দ্র উৎপত্তির বামদিকে, পরাবৃত্তটি বামদিকে খোলা

৩. উপরের দিকে খোলা

সমীকরণ: \(x^2 = 4ay\) \((a > 0)\)

শীর্ষ: \((0,0)\), উপকেন্দ্র: \((0,a)\), অক্ষ: \(y\)-অক্ষের ধনাত্মক দিকে

নিয়ামত: \(y = -a\)

বৈশিষ্ট্য: অক্ষ \(y\)-অক্ষের সমান্তরাল, উপরের দিকে খোলা

৪. নিচের দিকে খোলা

সমীকরণ: \(x^2 = -4ay\) \((a > 0)\)

শীর্ষ: \((0,0)\), উপকেন্দ্র: \((0,-a)\), অক্ষ: \(y\)-অক্ষের ঋণাত্মক দিকে

নিয়ামত: \(y = a\)

বৈশিষ্ট্য: নিচের দিকে খোলা, সমস্ত বিন্দু \(x\)-অক্ষের নিচে অবস্থিত

অনুবাদ্ত পরাবৃত্ত (Translated Parabola)

যখন পরাবৃত্তের শীর্ষ মূল বিন্দুতে না থেকে \((h, k)\) বিন্দুতে অবস্থিত, তখন সমীকরণের রূপ:

  • অক্ষ \(x\)-অক্ষের সমান্তরাল: \((y-k)^2 = 4a(x-h)\) বা \((y-k)^2 = -4a(x-h)\)
  • অক্ষ \(y\)-অক্ষের সমান্তরাল: \((x-h)^2 = 4a(y-k)\) বা \((x-h)^2 = -4a(y-k)\)

উদাহরণ: \((y-2)^2 = 8(x-3)\) পরাবৃত্তের কেন্দ্র, উপকেন্দ্র ও নিয়ামত নির্ণয় কর।

সমাধান: সমীকরণটি \((y-k)^2 = 4a(x-h)\) আকারের সাথে তুলনা করে:

\(h = 3, k = 2, 4a = 8 \Rightarrow a = 2\)

শীর্ষ: \((3, 2)\)

উপকেন্দ্র: \((h+a, k) = (5, 2)\)

নিয়ামত: \(x = h-a = 3-2 = 1\) অর্থাৎ \(x-1=0\)

সরলরেখার স্পর্শক ও স্পর্শ বিন্দু নির্ণয়

স্পর্শকের সংজ্ঞা

পরাবৃত্তের কোনো বিন্দুতে অঙ্কিত সরলরেখা যে রেখাটি পরাবৃত্তকে সেই বিন্দুতে স্পর্শ করে এবং অন্য কোনো বিন্দুতে ছেদ না করে, তাকে স্পর্শক (Tangent) বলে। স্পর্শকের সমীকরণ নির্ণয়ের বিভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে।

বিন্দু \((x_1, y_1)\) এ স্পর্শকের সমীকরণ

পরাবৃত্ত \(y^2 = 4ax\) এর বক্রতার উপর বিন্দু \((x_1, y_1)\) এ স্পর্শকের সমীকরণ:

\[yy_1 = 2a(x + x_1)\]

এই সূত্রটি অর্ধনীতি সূত্র (Rule of Tacit) অনুসরণ করে পাওয়া যায়: \(y^2\) এর পরিবর্তে \(yy_1\) এবং \(x\) এর পরিবর্তে \(\frac{x+x_1}{2}\) বসালে স্পর্শকের সমীকরণ পাওয়া যায়।

পরামিতিক বিন্দুতে স্পর্শকের সমীকরণ

বিন্দু \((at^2, 2at)\) এ স্পর্শকের সমীকরণ:

\[ty = x + at^2\]

বা, \(x - ty + at^2 = 0\)

এই সমীকরণের ঢাল (slope) হলো \(\frac{1}{t}\)।

ঢাল দেওয়া থাকলে স্পর্শকের সমীকরণ

যদি স্পর্শকের ঢাল \(m\) দেওয়া থাকে, তবে \(y^2 = 4ax\) পরাবৃত্তের স্পর্শকের সমীকরণ:

\[y = mx + \frac{a}{m}\]

যেকোনো ঢালের স্পর্শকের সমীকরণ এই রূপে প্রকাশ করা যায় এবং এটি সর্বদা \(y\)-অক্ষকে \(\frac{a}{m}\) বিন্দুতে ছেদ করে।

স্পর্শ বিন্দু নির্ণয়

সরলরেখা \(y = mx + c\) যদি পরাবৃত্ত \(y^2 = 4ax\) কে স্পর্শ করে, তবে \(c = \frac{a}{m}\) হতে হবে। স্পর্শ বিন্দুর স্থানাঙ্ক:

\[\left(\frac{a}{m^2}, \frac{2a}{m}\right)\]

উদাহরণ: \(y = 2x + 3\) রেখাটি \(y^2 = 16x\) পরাবৃত্তের স্পর্শক কিনা তা পরীক্ষা কর এবং স্পর্শ বিন্দু নির্ণয় কর।

সমাধান: এখানে \(m = 2, c = 3\) এবং পরাবৃত্তে \(4a = 16 \Rightarrow a = 4\)

স্পর্শকের শর্ত: \(c = \frac{a}{m} = \frac{4}{2} = 2\)

কিন্তু দেওয়া \(c = 3 \neq 2\), সুতরাং রেখাটি স্পর্শক নয়।

যদি স্পর্শক হতো, তবে স্পর্শ বিন্দু হতো \(\left(\frac{4}{4}, \frac{4}{1}\right) = (1, 4)\)

বহিঃস্থ বিন্দু হতে স্পর্শক অঙ্কন

পরাবৃত্তের বক্রতার বাইরের যেকোনো বিন্দু \((x_1, y_1)\) হতে দুটি স্পর্শক অঙ্কন করা যায়। এই স্পর্শকগুলোর সমীকরণ \(SS_1 = T^2\) সূত্র ব্যবহার করে পাওয়া যায়, যেখানে:

  • \(S = y^2 - 4ax = 0\)
  • \(S_1 = y_1^2 - 4ax_1\)
  • \(T = yy_1 - 2a(x + x_1)\)

এবং স্পর্শ বিন্দুদের যোজক রেখার (chord of contact) সমীকরণ \(T = 0\) অর্থাৎ \(yy_1 = 2a(x + x_1)\)।

অধিঃস্পর্শক (Normal)

পরাবৃত্তের কোনো বিন্দুতে অঙ্কিত অবকলনের লম্ব অর্থাৎ স্পর্শকের লম্ব রেখাকে অধিঃস্পর্শক (Normal) বলে।

বিন্দু \((x_1, y_1)\) এ অধিঃস্পর্শকের সমীকরণ:

\[y - y_1 = -\frac{y_1}{2a}(x - x_1)\]

পরামিতিক বিন্দু \((at^2, 2at)\) এ:

\[y + tx = 2at + at^3\]

ঢাল \(m\) বিশিষ্ট অধিঃস্পর্শকের সমীকরণ:

\[y = mx - 2am - am^3\]

যেকোনো ঢালের অধিঃস্পর্শক অঙ্কন করা যায়, তবে সর্বদা একটি নির্দিষ্ট \(c\) এর মানের জন্য।

জ্যা ও উপকেন্দ্রিক জ্যার বৈশিষ্ট্য

উপকেন্দ্র দিয়ে গমনকারী জ্যা (Focal Chord)

পরাবৃত্তের এমন জ্যা যা উপকেন্দ্র দিয়ে যায় তাকে উপকেন্দ্রিক জ্যা (Focal Chord) বলে। এই জ্যার বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এর প্রান্তবিন্দুদের পরামিতি \(t_1\) ও \(t_2\) এর জন্য \(t_1 \cdot t_2 = -1\) সম্পর্কটি বজায় থাকে।

অর্থাৎ, যদি একটি প্রান্তবিন্দু \((at^2, 2at)\) হয়, তবে অন্য প্রান্তবিন্দু হবে \(\left(\frac{a}{t^2}, -\frac{2a}{t}\right)\)।

উপকেন্দ্রিক জ্যার দৈর্ঘ্য

পরামিতি \(t\) বিশিষ্ট বিন্দু এবং \(-\frac{1}{t}\) বিশিষ্ট বিন্দুর সংযোজক রেখা উপকেন্দ্র দিয়ে যায়। এর দৈর্ঘ্য:

\[a\left(t + \frac{1}{t}\right)^2\]

সর্বনিম্ন দৈর্ঘ্য হয় যখন \(t = \pm 1\), অর্থাৎ যখন উপকেন্দ্রিক জ্যা উপকেন্দ্রিক লম্ব হয়। সুতরাং উপকেন্দ্রিক লম্ব হলো সবচেয়ে ছোট উপকেন্দ্রিক জ্যা।

অর্ধঘন (Subtangent) ও অর্ধলম্ব (Subnormal)

পরাবৃত্তের কোনো বিন্দুতে স্পর্শক অক্ষকে যে বিন্দুতে ছেদ করে, সেই বিন্দু থেকে ঐ বিন্দুর অভিলম্বের উপর অক্ষে অপতিত পাদের দূরত্বকে অর্ধঘন বলে।

বিন্দু \((x_1, y_1)\) এ অর্ধঘনের দৈর্ঘ্য = \(2x_1\) (অক্ষের উপর)

অর্ধলম্ব (Subnormal): অধিঃস্পর্শক অক্ষকে যে বিন্দুতে ছেদ করে সেই বিন্দু থেকে অভিলম্বের উপর অক্ষে অপতিত পাদের দূরত্ব।

অর্ধলম্বের দৈর্ঘ্য = \(2a\) (constant)

বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে অর্ধলম্বের দৈর্ঘ্য বিন্দুর অবস্থানের উপর নির্ভরশীল নয়, এটি সর্বদা \(2a\) সমান।

সাধারণ সমীকরণ ও লেখচিত্র নির্ণয়

দ্বিঘাত সমীকরণের পরিচয়

সাধারণ দ্বিঘাত সমীকরণ \(ax^2 + 2hxy + by^2 + 2gx + 2fy + c = 0\) একটি পরাবৃত্ত নির্দেশ করে যদি \(h^2 = ab\) হয় এবং সমীকরণটি দুটি বাস্তব ও বিভিন্ন সরলরেখায় বিশ্লেষণীয় না হয়।

বিশেষত, যদি \(h = 0\) এবং \(a = 0\) বা \(b = 0\) হয়, তবে সমীকরণটি \(x^2\) বা \(y^2\) রাশি বিশিষ্ট হয় এবং এটি পরাবৃত্তের সাধারণ রূপ।

লেখচিত্র অঙ্কনের ধাপ

পরাবৃত্তের লেখচিত্র অঙ্কন করতে হলে নিম্নলিখিত তথ্যগুলো প্রয়োজন:

  1. সমীকরণটিকে প্রমিত রূপে রূপান্তর করে \(a\) এর মান নির্ণয়
  2. শীর্ষবিন্দুর স্থানাঙ্ক নির্ণয়
  3. উপকেন্দ্রের অবস্থান চিহ্নিত করা
  4. নিয়ামত রেখা অঙ্কন
  5. উপকেন্দ্রিক লম্বের প্রান্তবিন্দু নির্ণয় ও চিহ্নিত করা
  6. কিছু বিন্দু নির্ণয় করে বক্ররেখা অঙ্কন (যেমন \(x = a\) বসালে \(y = \pm 2a\) পাওয়া যায়)

উদাহরণ: \(y^2 - 6y - 8x + 17 = 0\) এর লেখচিত্র নির্ণয় কর।

সমাধান: \(y\) রাশিকে পূর্ণবর্গ করে:

\((y-3)^2 - 9 - 8x + 17 = 0\)

\((y-3)^2 = 8x - 8 = 8(x-1)\)

অর্থাৎ \((y-3)^2 = 4 \cdot 2 \cdot (x-1)\)

সুতরাং শীর্ষ \((1, 3)\), \(a = 2\), উপকেন্দ্র \((3, 3)\), নিয়ামত \(x = -1\)

সংক্ষিপ্ত সারাংশ

  • কনিকের সংজ্ঞা: উপকেন্দ্র ও নিয়ামত থেকে দূরত্বের অনুপাত \(e = 1\) হলে পরাবৃত্ত হয়।
  • প্রমিত সমীকরণ: \(y^2 = 4ax\) যার শীর্ষ \((0,0)\), উপকেন্দ্র \((a,0)\), নিয়ামত \(x+a=0\)।
  • উপকেন্দ্রিক লম্ব: দৈর্ঘ্য \(4a\), প্রান্তবিন্দু \((a, \pm 2a)\)।
  • পরামিতিক সমীকরণ: \(x = at^2, y = 2at\) যেখানে পরামিতি \(t\)।
  • স্পর্শকের সমীকরণ: বিন্দু \((x_1, y_1)\) এ \(yy_1 = 2a(x+x_1)\); ঢাল \(m\) হলে \(y = mx + \frac{a}{m}\)।
  • স্পর্শ বিন্দু: ঢাল \(m\) বিশিষ্ট স্পর্শকের স্পর্শ বিন্দু \(\left(\frac{a}{m^2}, \frac{2a}{m}\right)\)।
  • অধিঃস্পর্শক: পরামিতি \(t\) এ \(y + tx = 2at + at^3\)।
  • উপকেন্দ্রিক জ্যা: প্রান্তবিন্দুদের পরামিতির গুণফল \(-1\); সর্বনিম্ন দৈর্ঘ্যের উপকেন্দ্রিক জ্যা হলো উপকেন্দ্রিক লম্ব।
  • অর্ধলম্ব: দৈর্ঘ্য সর্বদা \(2a\), বিন্দুর অবস্থানের উপর নির্ভরশীল নয়।

পরাবৃত্তের এ সকল ধর্মগুলো জ্যামিতিক সমস্যার সমাধানে এবং পদার্থবিজ্ঞানে প্রক্ষেপবিদ্যা (projectile motion), দর্পণ ও লেন্সের সূত্রাবলীতে ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করা হয়। বিশেষ করে পরাবৃত্তীয় দর্পণের প্রতিফলন ধর্ম উপকেন্দ্র দিয়ে আসা সমস্ত কিরণকে অক্ষের সমান্তরাল করে প্রতিফলিত করে, যা টেলিস্কোপ ও সার্চলাইটের নকশায় ব্যবহৃত হয়।