১১.১ আয়তক্ষেত্রাকার কার্টেসিয়ান স্থানাঙ্ক (Rectangular Cartesian Coordinates)

স্থানাঙ্ক জ্যামিতি (Coordinate Geometry) হলো বীজগাণিতিক সূত্রের সাহায্যে জ্যামিতিক সমস্যা সমাধানের পদ্ধতি। এই অধ্যায়ে আমরা কার্টেসিয়ান স্থানাঙ্ক পদ্ধতি, দূরত্ব নির্ণয়, বিন্দুর অনুপাত বিভাজন, ত্রিভুজের ক্ষেত্রফল এবং কেন্দ্রক নির্ণয় শিখব।

কার্টেসিয়ান স্থানাঙ্ক পদ্ধতি (Cartesian Coordinate System)

সংজ্ঞা:

একটি সমতলে দুটি পরস্পর লম্ব অক্ষ (Axes) নিয়ে গঠিত পদ্ধতিকে আয়তক্ষেত্রাকার কার্টেসিয়ান স্থানাঙ্ক পদ্ধতি বলে। অনুভূমিক অক্ষকে \( x \)-অক্ষ (ভুজ) এবং উল্লম্ব অক্ষকে \( y \)-অক্ষ (কোটি) বলে। তাদের ছেদবিন্দুকে উৎপত্তি (Origin) বলে এবং এর স্থানাঙ্ক \( (0, 0) \)।

স্থানাঙ্ক নির্ণয়

সমতলের যেকোনো বিন্দু \( P \) এর অবস্থান দুটি সংখ্যা দ্বারা নির্দেশ করা হয়:

  • ভুজ (Abscissa): বিন্দু থেকে \( y \)-অক্ষের উপর লম্ব দূরত্ব (সাধারণত \( x \) দ্বারা সূচিত)
  • কোটি (Ordinate): বিন্দু থেকে \( x \)-অক্ষের উপর লম্ব দূরত্ব (সাধারণত \( y \) দ্বারা সূচিত)
বিন্দু \( P \) এর স্থানাঙ্ক লেখা হয় \( (x, y) \) আকারে।

চতুর্ভাগ (Quadrants)

দুটি অক্ষ পরস্পর ছেদ করে চারটি চতুর্ভাগ তৈরি করে:

চতুর্ভাগ \( x \) এর চিহ্ন \( y \) এর চিহ্ন স্থানাঙ্ক
প্রথম ধনাত্মক (+) ধনাত্মক (+) \( (+, +) \)
দ্বিতীয় ঋণাত্মক (−) ধনাত্মক (+) \( (-, +) \)
তৃতীয় ঋণাত্মক (−) ঋণাত্মক (−) \( (-, -) \)
চতুর্থ ধনাত্মক (+) ঋণাত্মক (−) \( (+, -) \)
মনে রাখুন: \( x \)-অক্ষের উপর সকল বিন্দুর কোটি \( 0 \) এবং \( y \)-অক্ষের উপর সকল বিন্দুর ভুজ \( 0 \)।

দূরত্ব সূত্র (Distance Formula)

সূত্র:

দুটি বিন্দু \( P(x_1, y_1) \) এবং \( Q(x_2, y_2) \) এর মধ্যকার দূরত্ব: \[ PQ = \sqrt{(x_2 - x_1)^2 + (y_2 - y_1)^2} \]

অথবা: \[ d = \sqrt{(x_1 - x_2)^2 + (y_1 - y_2)^2} \]

বিশেষ ক্ষেত্র: উৎপত্তি হতে দূরত্ব

বিন্দু \( (x, y) \) এর উৎপত্তি \( (0, 0) \) হতে দূরত্ব: \[ d = \sqrt{x^2 + y^2} \]

উদাহরণ:

বিন্দু \( A(3, 4) \) এবং \( B(6, 8) \) এর মধ্যে দূরত্ব নির্ণয় কর।

সমাধান:

\[ AB = \sqrt{(6-3)^2 + (8-4)^2} \]

\[ = \sqrt{3^2 + 4^2} = \sqrt{9 + 16} = \sqrt{25} = 5 \]

সুতরাং দূরত্ব \( = 5 \) একক।

বিন্দু সংরক্ষণের শর্ত

যদি তিনটি বিন্দু \( A, B, C \) এর মধ্যে \( AB + BC = AC \) হয়, তবে বিন্দুগুলো সরলরেখিক (Collinear)।

অনুপাত সূত্র বা বিভাজন সূত্র (Section Formula)

একটি বিন্দু অন্য দুটি বিন্দুকে সংযোগকারী রেখাংশকে নির্দিষ্ট অনুপাতে বিভাজন করলে তার স্থানাঙ্ক নির্ণয়ের সূত্র।

১. অন্তর্বিভাজন (Internal Division)

যদি বিন্দু \( R(x, y) \), বিন্দু \( P(x_1, y_1) \) এবং \( Q(x_2, y_2) \) কে সংযোগকারী রেখাংশকে অনুপাত \( m : n \) এ অন্তর্বিভাজন করে, তবে: \[ x = \frac{mx_2 + nx_1}{m + n}, \quad y = \frac{my_2 + ny_1}{m + n} \]

২. বহির্বিভাজন (External Division)

যদি বিন্দু \( R(x, y) \), রেখাংশ \( PQ \) কে অনুপাত \( m : n \) এ বহির্বিভাজন করে (যেখানে \( m > n \)), তবে: \[ x = \frac{mx_2 - nx_1}{m - n}, \quad y = \frac{my_2 - ny_1}{m - n} \]

৩. মধ্যবিন্দুর সূত্র (Midpoint Formula)

যখন \( m = n = 1 \) (অর্ধেক অনুপাত):

মধ্যবিন্দুর স্থানাঙ্ক: \[ \left( \frac{x_1 + x_2}{2}, \frac{y_1 + y_2}{2} \right) \]

উদাহরণ:

বিন্দু \( (2, 3) \) এবং \( (4, 7) \) কে সংযোগকারী রেখাংশের মধ্যবিন্দুর স্থানাঙ্ক নির্ণয় কর।

সমাধান:

\[ x = \frac{2 + 4}{2} = 3, \quad y = \frac{3 + 7}{2} = 5 \]

মধ্যবিন্দু \( = (3, 5) \)

ত্রিভুজের ক্ষেত্রফল (Area of Triangle)

সূত্র:

তিনটি বিন্দু \( A(x_1, y_1) \), \( B(x_2, y_2) \) এবং \( C(x_3, y_3) \) দ্বারা গঠিত ত্রিভুজের ক্ষেত্রফল: \[ \Delta = \frac{1}{2} |x_1(y_2 - y_3) + x_2(y_3 - y_1) + x_3(y_1 - y_2)| \]

অথবা নির্ণায়ক আকারে: \[ \Delta = \frac{1}{2} \left| \begin{vmatrix} x_1 & y_1 & 1 \\ x_2 & y_2 & 1 \\ x_3 & y_3 & 1 \end{vmatrix} \right| \]

সরলরেখিক শর্ত (Collinearity Condition)

তিনটি বিন্দু সরলরেখিক হবে যদি তাদের দ্বারা গঠিত ত্রিভুজের ক্ষেত্রফল শূন্য হয়: \[ x_1(y_2 - y_3) + x_2(y_3 - y_1) + x_3(y_1 - y_2) = 0 \]

উদাহরণ:

বিন্দু \( A(1, 2) \), \( B(4, 5) \), \( C(7, 8) \) দ্বারা গঠিত ত্রিভুজের ক্ষেত্রফল নির্ণয় কর।

সমাধান:

\[ \Delta = \frac{1}{2} |1(5-8) + 4(8-2) + 7(2-5)| \]

\[ = \frac{1}{2} |1(-3) + 4(6) + 7(-3)| \]

\[ = \frac{1}{2} |-3 + 24 - 21| = \frac{1}{2} |0| = 0 \]

ক্ষেত্রফল \( 0 \), সুতরাং বিন্দুগুলো সরলরেখিক।

ত্রিভুজের কেন্দ্রক (Centroid)

ভরকেন্দ্র (Centroid):

ত্রিভুজের তিনটি শীর্ষবিন্দু \( A(x_1, y_1) \), \( B(x_2, y_2) \), \( C(x_3, y_3) \) হলে ভরকেন্দ্র \( G \) এর স্থানাঙ্ক: \[ G = \left( \frac{x_1 + x_2 + x_3}{3}, \frac{y_1 + y_2 + y_3}{3} \right) \]

ভরকেন্দ্র হলো ত্রিভুজের তিনটি মধ্যমার ছেদবিন্দু এবং এটি প্রতিটি মধ্যমাকে \( 2:1 \) অনুপাতে বিভাজন করে।

উদাহরণ:

ত্রিভুজের শীর্ষবিন্দু \( (1, 2) \), \( (3, 4) \), \( (5, 6) \) হলে ভরকেন্দ্র নির্ণয় কর।

সমাধান:

\[ x = \frac{1 + 3 + 5}{3} = \frac{9}{3} = 3 \]

\[ y = \frac{2 + 4 + 6}{3} = \frac{12}{3} = 4 \]

ভরকেন্দ্র \( = (3, 4) \)

বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমূহ

১. সমান্তরাল চতুর্ভাজক (Parallelogram Law)

সমান্তরাল চতুর্ভাজকের কর্ণদ্বয় পরস্পরকে সমদ্বিখণ্ডিত করে।

২. সমবাহু ত্রিভুজের শর্ত

তিন বাহুর দৈর্ঘ্য সমান হতে হবে: \( AB = BC = CA \)

৩. সমকোণী ত্রিভুজের শর্ত (পিথাগোরাস)

তিন বিন্দু \( A, B, C \) সমকোণী ত্রিভুজ গঠন করবে যদি: \[ AB^2 + BC^2 = AC^2 \] বা যেকোনো অনুরূপ সম্পর্ক পূরণ করে।

৪. বিভিন্ন কেন্দ্রের স্থানাঙ্ক (উল্লেখযোগ্য)

  • পরিকেন্দ্র (Circumcenter): লম্বসমদ্বিখণ্ডকের ছেদবিন্দু
  • অন্তঃকেন্দ্র (Incenter): কোণসমদ্বিখণ্ডকের ছেদবিন্দু
  • লম্ববিন্দু (Orthocenter): উচ্চতার ছেদবিন্দু

সংক্ষিপ্ত সারাংশ

  • স্থানাঙ্ক: \( (x, y) \) যেখানে \( x \) = ভুজ (দূরত্ব \( y \)-অক্ষ হতে), \( y \) = কোটি (দূরত্ব \( x \)-অক্ষ হতে)।
  • দূরত্ব সূত্র: দুই বিন্দু \( (x_1, y_1) \) এবং \( (x_2, y_2) \) এর মধ্যে দূরত্ব \( = \sqrt{(x_2-x_1)^2 + (y_2-y_1)^2} \)।
  • অনুপাত সূত্র (অন্তর্বিভাজন): \( \left( \frac{mx_2 + nx_1}{m+n}, \frac{my_2 + ny_1}{m+n} \right) \)।
  • মধ্যবিন্দু: \( \left( \frac{x_1 + x_2}{2}, \frac{y_1 + y_2}{2} \right) \)।
  • ত্রিভুজের ক্ষেত্রফল: \( \frac{1}{2} |x_1(y_2-y_3) + x_2(y_3-y_1) + x_3(y_1-y_2)| \)।
  • সরলরেখিক শর্ত: ক্ষেত্রফল \( = 0 \)।
  • ভরকেন্দ্র: \( \left( \frac{x_1+x_2+x_3}{3}, \frac{y_1+y_2+y_3}{3} \right) \)।
  • চতুর্ভাগ: প্রথম \( (+,+) \), দ্বিতীয় \( (-,+) \), তৃতীয় \( (-,-) \), চতুর্থ \( (+,-) \)।