৩.২ ত্রিভুজের বিশেষ বিন্দু ও বৃত্তবিষয়ক উপপাদ্য

একটি ত্রিভুজের বিভিন্ন রেখার ছেদবিন্দুগুলো বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। এই অধ্যায়ে আমরা পরিকেন্দ্র (Circumcenter), ভরকেন্দ্র (Centroid), লম্ববিন্দু (Orthocenter), এবং অন্তঃকেন্দ্র (Incenter) সংক্রান্ত উপপাদ্যসমূহ এবং ত্রিভুজ ও বৃত্তের মধ্যকার সম্পর্ক আলোচনা করব।

পরিকেন্দ্র (Circumcenter)

সংজ্ঞা

ত্রিভুজের তিন বাহুর লম্বসমদ্বিখণ্ডক (Perpendicular Bisectors) যে বিন্দুতে ছেদ করে তাকে ত্রিভুজের পরিকেন্দ্র (Circumcenter) বলে। একে সাধারণত \( O \) দ্বারা সূচিত করা হয়।

উপপাদ্য:

ত্রিভুজের তিন বাহুর লম্বসমদ্বিখণ্ডক এক বিন্দুতে ছেদ করে এবং ঐ বিন্দুটি তিনটি শীর্ষবিন্দু থেকে সমদূরত্বে অবস্থিত করে।

$$OA = OB = OC = R$$

যেখানে \( R \) হলো পরিব্যাসার্ধ (Circumradius)।

পরিলিখিত বৃত্ত (Circumcircle)

পরিকেন্দ্রকে কেন্দ্র করে এবং পরিব্যাসার্ধ \( R \) ব্যসার্ধ অঙ্কিত বৃত্ত ত্রিভুজের তিনটি শীর্ষবিন্দু দিয়ে যায়। একে পরিলিখিত বৃত্ত বলে।

ত্রিভুজের প্রকারভেদ অনুযায়ী পরিকেন্দ্রের অবস্থান

  • সূক্ষ্মকোণী ত্রিভুজ: পরিকেন্দ্র ত্রিভুজের ভিতরে অবস্থিত।
  • স্থূলকোণী ত্রিভুজ: পরিকেন্দ্র ত্রিভুজের বাইরে অবস্থিত (স্থূলকোণের বিপরীত দিকে)।
  • সমকোণী ত্রিভুজ: পরিকেন্দ্র অতিভুজের মধ্যবিন্দুতে অবস্থিত করে।
    গুরুত্বপূর্ণ: সমকোণী ত্রিভুজের ক্ষেত্রে \( R = \frac{c}{2} \), যেখানে \( c \) অতিভুজ। অর্থাৎ পরিব্যাসার্ধ = অতিভুজের অর্ধেক।

পরিব্যাসার্ধের সূত্র

সাইন উপপাদ্য অনুযায়ী:

$$\frac{a}{\sin A} = \frac{b}{\sin B} = \frac{c}{\sin C} = 2R$$

ত্রিভুজের ক্ষেত্রফল \( \Delta \) হলে: $$R = \frac{abc}{4\Delta}$$

ভরকেন্দ্র (Centroid)

সংজ্ঞা

ত্রিভুজের তিনটি মধ্যমা (Median) যে বিন্দুতে ছেদ করে তাকে ভরকেন্দ্র (Centroid) বলে। একে সাধারণত \( G \) দ্বারা সূচিত করা হয়। ভরকেন্দ্র ত্রিভুজের ভরভারসাম্যের কেন্দ্র বা ভারকেন্দ্র।

উপপাদ্য:

ত্রিভুজের তিনটি মধ্যমা এক বিন্দুতে ছেদ করে এবং ঐ বিন্দু প্রতিটি মধ্যমাকে \( 2:1 \) অনুপাতে বিভক্ত করে (শীর্ষবিন্দু থেকে দিকে \( 2 \) অংশ এবং বাহুর মধ্যবিন্দুর দিকে \( 1 \) অংশ)।

অর্থাৎ, মধ্যমা \( AD \) এর ক্ষেত্রে: $$AG : GD = 2 : 1$$ বা, \( AG = \frac{2}{3}AD \) এবং \( GD = \frac{1}{3}AD \)

ভরকেন্দ্রের স্থানাঙ্ক (স্থানাঙ্ক জ্যামিতিতে)

যদি ত্রিভুজের শীর্ষবিন্দুগুলোর স্থানাঙ্ক \( A(x_1, y_1) \), \( B(x_2, y_2) \), \( C(x_3, y_3) \) হয়, তবে ভরকেন্দ্র:

$$G\left(\frac{x_1+x_2+x_3}{3}, \frac{y_1+y_2+y_3}{3}\right)$$

মধ্যমার দৈর্ঘ্যের সূত্র (Apollonius থেকে)

তিনটি মধ্যমার দৈর্ঘ্য যথাক্রমে \( m_a, m_b, m_c \) হলে:

  • \( m_a = \frac{1}{2}\sqrt{2b^2+2c^2-a^2} \)
  • \( m_b = \frac{1}{2}\sqrt{2c^2+2a^2-b^2} \)
  • \( m_c = \frac{1}{2}\sqrt{2a^2+2b^2-c^2} \)

এবং তিনটি মধ্যমার বর্গের যোগফল: $$m_a^2 + m_b^2 + m_c^2 = \frac{3}{4}(a^2+b^2+c^2)$$

লম্ববিন্দু (Orthocenter)

সংজ্ঞা

ত্রিভুজের তিনটি উচ্চতা (Altitude) বা লম্ব রেখা যে বিন্দুতে ছেদ করে তাকে লম্ববিন্দু (Orthocenter) বলে। একে সাধারণত \( H \) দ্বারা সূচিত করা হয়।

উপপাদ্য:

ত্রিভুজের তিনটি উচ্চতা এক বিন্দুতে ছেদ করে।

ত্রিভুজের প্রকারভেদ অনুযায়ী লম্ববিন্দুর অবস্থান

  • সূক্ষ্মকোণী ত্রিভুজ: লম্ববিন্দু ত্রিভুজের ভিতরে অবস্থিত।
  • স্থূলকোণী ত্রিভুজ: লম্ববিন্দু ত্রিভুজের বাইরে অবস্থিত (স্থূলকোণের বিপরীত দিকে)।
  • সমকোণী ত্রিভুজ: লম্ববিন্দু সমকোণের শীর্ষবিন্দুতে অবস্থিত করে।

উদাহরণ:

সমবাহু ত্রিভুজের ক্ষেত্রে লম্ববিন্দু, ভরকেন্দ্র, পরিকেন্দ্র এবং অন্তঃকেন্দ্র - চারটি একই বিন্দুতে অবস্থিত করে।

অন্তঃকেন্দ্র (Incenter)

সংজ্ঞা

ত্রিভুজের তিনটি কোণসমদ্বিখণ্ডক (Angle Bisectors) যে বিন্দুতে ছেদ করে তাকে অন্তঃকেন্দ্র (Incenter) বলে। একে সাধারণত \( I \) দ্বারা সূচিত করা হয়।

উপপাদ্য:

ত্রিভুজের তিনটি অভ্যন্তরীণ কোণের সমদ্বিখণ্ডক এক বিন্দুতে ছেদ করে এবং ঐ বিন্দুটি ত্রিভুজের তিন বাহু থেকে সমদূরত্বে অবস্থিত করে।

যদি অন্তঃকেন্দ্র থেকে তিন বাহুর উপর অঙ্কিত লম্বের দৈর্ঘ্য \( r \) (অন্তর্ব্যাসার্ধ) হয়, তবে:

$$r = \frac{\Delta}{s}$$

যেখানে \( \Delta \) = ক্ষেত্রফল এবং \( s = \frac{a+b+c}{2} \) (অর্ধপরিসীমা)।

অন্তর্লিখিত বৃত্ত (Incircle)

অন্তঃকেন্দ্রকে কেন্দ্র করে এবং অন্তর্ব্যাসার্ধ \( r \) ব্যবহার করে অঙ্কিত বৃত্ত ত্রিভুজের তিনটি বাহুকে স্পর্শ করে। একে অন্তর্লিখিত বৃত্ত বলে।

বাহ্যিক কেন্দ্র (Excenters)

একটি কোণের অন্তঃসমদ্বিখণ্ডক এবং অন্য দুই কোণের বহিঃসমদ্বিখণ্ডক যে বিন্দুতে ছেদ করে তাকে বাহ্যিক কেন্দ্র (Excenter) বলে। একটি ত্রিভুজের তিনটি বাহ্যিক কেন্দ্র থাকে (\( I_1, I_2, I_3 \))।

বাহ্যিক কেন্দ্র থেকে অঙ্কিত বৃত্ত (Excircle) একটি বাহুকে ও অপর দুই বাহুর বর্ধিতাংশকে স্পর্শ করে।

অয়লার রেখা (Euler Line)

সুইস গণিতবিদ লিওনার্ড অয়লার (Leonard Euler) প্রমাণ করেন যে, অসমবাহু ত্রিভুজের পরিকেন্দ্র (\( O \)), ভরকেন্দ্র (\( G \)) এবং লম্ববিন্দু (\( H \)) - এই তিনটি বিন্দু সরলরেখিক (Collinear) এবং একই সরলরেখায় অবস্থিত করে।

অয়লার রেখার উপপাদ্য:

ত্রিভুজের পরিকেন্দ্র, ভরকেন্দ্র ও লম্ববিন্দু একই সরলরেখায় অবস্থিত করে এবং ভরকেন্দ্র, পরিকেন্দ্র ও লম্ববিন্দুর মধ্যবিন্দু।

অর্থাৎ: $$OG : GH = 1 : 2$$ বা, \( HG = 2GO \) এবং \( HO = 3GO \)

বিশেষ ক্ষেত্র: সমবাহু ত্রিভুজের ক্ষেত্রে চারটি কেন্দ্র (পরিকেন্দ্র, ভরকেন্দ্র, লম্ববিন্দু, অন্তঃকেন্দ্র) একই বিন্দুতে মিলিত হয়, সুতরাং অয়লার রেখা সংজ্ঞায়িত হয় না (বা দৈর্ঘ্য শূন্য)।

দূরত্বের সম্পর্ক

অয়লারের দূরত্ব সূত্র: $$OH^2 = 9R^2 - (a^2+b^2+c^2)$$ বা, $$OI^2 = R(R-2r)$$ (অন্তঃকেন্দ্র ও পরিকেন্দ্রের দূরত্ব)

নয়-বিন্দু বৃত্ত (Nine-Point Circle)

ত্রিভুজের সাথে সম্পর্কিত একটি বিশেষ বৃত্ত যা নয়টি গুরুত্বপূর্ণ বিন্দু দিয়ে যায়। একে ফয়েরবাখ বৃত্ত (Feuerbach Circle) ও বলা হয়।

উপপাদ্য:

যেকোনো ত্রিভুজের নিম্নলিখিত নয়টি বিন্দু একই বৃত্তে অবস্থিত:

  1. তিন বাহুর মধ্যবিন্দু (৩টি)
  2. তিন উচ্চতার পাদবিন্দু (৩টি)
  3. শীর্ষবিন্দু ও লম্ববিন্দুর সংযোগ রেখাংশের তিনটি মধ্যবিন্দু (৩টি)

নয়-বিন্দু বৃত্তের বৈশিষ্ট্য

  • এর কেন্দ্র (\( N \)) হলো লম্ববিন্দু (\( H \)) ও পরিকেন্দ্র (\( O \)) এর সংযোগ রেখাংশের মধ্যবিন্দু।
  • এর ব্যবাসার্ধ \( = \frac{R}{2} \) (পরিব্যাসার্ধের অর্ধেক)।
  • এটি অয়লার রেখার উপর অবস্থিত।
  • ফয়েরবাখ উপপাদ্য: নয়-বিন্দু বৃত্ত অন্তর্লিখিত বৃত্তকে স্পর্শ করে (ত্রিভুজের জন্য)।

ত্রিভুজ ও বৃত্তের সম্পর্ক

স্পর্শক-ছেদক উপপাদ্য (Tangent-Secant Theorem)

বৃত্তের বহির্স্থ কোনো বিন্দু থেকে অঙ্কিত স্পর্শকের বর্গ = ঐ বিন্দু থেকে অঙ্কিত ছেদকের বাহ্যিক অংশ ও সম্পূর্ণ ছেদকের গুণফলের সমান।

$$PT^2 = PA \times PB$$

যেখানে \( PT \) স্পর্শক এবং \( PAB \) ছেদক।

জ্যা-ছেদক উপপাদ্য (Intersecting Chords Theorem)

বৃত্তের ভেতর দিয়ে যাওয়া দুই জ্যা পরস্পর যে বিন্দুতে ছেদ করে, সেই বিন্দুতে উৎপন্ন খণ্ডদ্বয়ের গুণফল পরস্পর সমান।

$$PA \times PB = PC \times PD$$

সমকোণী ত্রিভুজ ও বৃত্ত

  • সমকোণী ত্রিভুজের অতিভুজ পরিলিখিত বৃত্তের ব্যাস হয়।
  • অতিভুজের মধ্যবিন্দুই পরিকেন্দ্র।
  • অন্তর্লিখিত বৃত্তের কেন্দ্র থেকে অতিভুজের দূরত্ব \( = \frac{c}{2} - r \)।

সমবাহু ত্রিভুজের ক্ষেত্রে

পাশ \( a \) বিশিষ্ট সমবাহু ত্রিভুজের জন্য:

  • পরিব্যাসার্ধ: \( R = \frac{a}{\sqrt{3}} \)
  • অন্তর্ব্যাসার্ধ: \( r = \frac{a}{2\sqrt{3}} \)
  • সম্পর্ক: \( R = 2r \) (অর্থাৎ পরিকেন্দ্র থেকে ভরকেন্দ্রের দূরত্ব \( = \frac{a}{2\sqrt{3}} \))

পাদলম্ব ত্রিভুজ (Pedal Triangle) - অতিরিক্ত

লম্ববিন্দু (\( H \)) থেকে তিন বাহুর উপর অঙ্কিত লম্বের পাদবিন্দু তিনটি যে ত্রিভুজ গঠন করে তাকে পাদলম্ব ত্রিভুজ বলে।

  • সূক্ষ্মকোণী ত্রিভুজের পাদলম্ব ত্রিভুজের পরিসীমা \( = 4R\sin A \sin B \sin C \)
  • এর ক্ষেত্রফল \( = 2\Delta \cos A \cos B \cos C \)
  • লম্ববিন্দু হলো পাদলম্ব ত্রিভুজের অন্তঃকেন্দ্র

সংক্ষিপ্ত সারাংশ

  • পরিকেন্দ্র (\( O \)): লম্বসমদ্বিখণ্ডকের ছেদবিন্দু, পরিলিখিত বৃত্তের কেন্দ্র, \( OA = OB = OC = R \)।
  • ভরকেন্দ্র (\( G \)): মধ্যমার ছেদবিন্দু, \( AG:GD = 2:1 \), ত্রিভুজের ভারকেন্দ্র।
  • লম্ববিন্দু (\( H \)): উচ্চতার ছেদবিন্দু, তিনটি উচ্চতা এক বিন্দুতে মিলিত হয়।
  • অন্তঃকেন্দ্র (\( I \)): কোণসমদ্বিখণ্ডকের ছেদবিন্দু, অন্তর্লিখিত বৃত্তের কেন্দ্র, তিন বাহু থেকে সমদূরত্বে।
  • অয়লার রেখা: \( O, G, H \) সরলরেখিক এবং \( OG:GH = 1:2 \)।
  • নয়-বিন্দু বৃত্ত: মধ্যবিন্দু, উচ্চতার পাদ ও \( H \) সংযোগ রেখার মধ্যবিন্দু দিয়ে যায়, এর ব্যবাসার্ধ \( R/2 \)।